বিশ্ব স্মরণে আন্তর্জাতিক শ্রমিক দিবস

351

মো: ফেরদৌস রহমান, নারায়ণগঞ্জ :- বিশ্বের প্রায় সকল দেশে আন্তর্জাতিক শ্রমিক দিবস পালন করা হয় ১লা মে। প্রতি বছর ১লা মে তারিখে আন্তর্জাতিক শ্রমিক আন্দোলনের উদযাপন দিবস অর্থাৎ আন্তর্জাতিক শ্রমিক দিবস পালন করা হয় যা সচরাচর “মে দিবস” নামে পরিচিত।

“মে দিবস” একটি আন্তর্জাতিক শ্রমিক আন্দোলনের উদযাপন দিবস। পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে শ্রমজীবী মানুষ এবং শ্রমিক সংগঠনসমূহ রাজপথে সংগঠিতভাবে মিছিল ও শোভাযাত্রার মাধ্যমে দিবসটি পালন করে থাকে। বাংলাদেশসহ বিশ্বের প্রায় ৮০ টি দেশে ১ লা মে জাতীয় ছুটির দিন ধার্য করা হয়েছে। বিশ্বের আরো অনেক দেশে এই দিবসটি বেসরকারিভাবে পালিত হয়।

এই দিবসের আনুষ্ঠানিক নাম হলো: “আন্তর্জাতিক শ্রমিক দিবস “, অন্য নাম হলো: ” মে দিবস”( ১লা মে উদযাপন করা হয় বলে)। বিভিন্ন কর্মজীবী শ্রমিক এবং বিভিন্ন শ্রমিক ইউনিয়ন এই দিবসটির পালনকারী। এটি উদযাপন করা হয়- সম্মিলিত শোভাযাত্রার মাধ্যমে।

১৮৮৬ খ্রিস্টাব্দে আমেরিকার শিকাগো শহরের “হে মার্কেটের” ম্যাসাকার শহিদদের আত্মত্যাগকে স্মরণে পালিত হয় এই দিবসটি। সেদিন দৈনিক ৮ ঘণ্টা কাজের দাবিতে শ্রমিকরা হে মার্কেটে জমায়েত হয়েছিল। পুলিশ, যারা শ্রমিকদের ঘিরে রেখেছিল, সেই পুলিশের প্রতি এক অজ্ঞাতনামার বোমা নিক্ষেপের পর, পুলিশ শ্রমিকদের উপর গুলিবর্ষণ শুরু করে। ফলে,প্রায় ১০-১২ জন শ্রমিক ও পুলিশ নিহত হয়। ১৮৮৯ খ্রিস্টাব্দে, ফরাসি বিপ্লবের শতবার্ষিকীতে প্যারিসে দ্বিতীয় আন্তর্জাতিকের প্রথম কংগ্রেস অনুষ্ঠিত হয়। সেখানে ১৮৯০ খ্রিস্টাব্দ থেকে শিকাগো প্রতিবাদের বার্ষিকী আন্তর্জাতিকভাবে বিভিন্ন দেশে পালন করার প্রস্তাব করেন রেমন্ড লাভিনে। ১৮৯১ খ্রিস্টাব্দে আন্তর্জাতিকের দ্বিতীয় কংগ্রেসে এই প্রস্তাব আনুষ্ঠানিকভাবে গৃহীত হয়। এর পরপরই ১৮৯৪ খ্রিস্টাব্দে মে দিবসের দাঙ্গার ঘটনা ঘটে। পরে, ১৯০৪ খ্রিস্টাব্দে আমস্টারডামে শহরে অনুষ্ঠিত সমাজতন্ত্রীদের আন্তর্জাতিক সন্মেলনে এই উপলক্ষে একটি প্রস্তাব গৃহীত হয়। প্রস্তাবে দৈনিক ৮ ঘণ্টা কাজের সময় নির্ধারণের দাবি আদায়ের জন্য এবং শান্তি প্রতিষ্ঠার জন্য বিশ্বজুড়ে ১লা মে তারিখে মিছিল ও শোভাযাত্রার আয়োজন করতে,সকল সমাজবাদী গণতান্ত্রিক দল এবং শ্রমিক সংঘের(Trade Union) প্রতি আহবান জানানো হয়।

সেই সম্মেলনে, শ্রমিকদের হতাহতের সম্ভাবনা না-থাকলে, বিশ্বজুড়ে সকল শ্রমিক সংগঠন মে মাসের ১ তারিখে বাধ্যতামূলকভাবে কাজ না-করার সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেন। অনেক দেশে শ্রমজীবী জনতা মে মাসের ১ তারিখকে সরকারি ছুটির দিন হিসেবে পালনের দাবি জানায় এবং অনেক দেশে তা কার্যকর করা হয়।

দীর্ঘদিন ধরে সমাজতান্ত্রিক, কমিউনিস্ট এবং কিছু কট্টর সংগঠন তাদের দাবি জানানোর জন্য মে দিবস-কে মূখ্য দিন হিসেবে বেছে নেয়। কোনো কোনো স্থানে শিকাগোর হে মার্কেটের আত্মত্যাগী শ্রমিকদের স্মরণে আগুনও জ্বালানো হয়ে থাকে। পূর্বতন সোভিয়েত রাষ্ট্র, চীন, কিউবাসহ বিশ্বের অনেক দেশেই “মে দিবস” একটি তাৎপর্যপূর্ণ দিন। এমনকি সেসব দেশে এ উপলক্ষ্যে সামরিক কুচকাওয়াজের আয়োজন করা হয়। যথাযথভাবে, বাংলাদেশ ও ভারতে এই দিনটি পূর্ণ মর্যাদার সহিত পালিত হয়। ভারতে প্রথম “মে দিবস” পালিত হয় ১৯২৩ খ্রিস্টাব্দে।

আমেরিকা ও কানাডাতে এই দিবসটি পালন করা হয় সেপ্টেম্বর মাসে। কারণ, সেখানের কেন্দ্রীয় শ্রমিক ইউনিয়ন ( Central Workers Union) এবং শ্রমের নাইট, এই দিনটি পালনের উদ্যোক্তা। “হে মার্কেটর” হত্যাকাণ্ডের পর আমেরিকার তৎকালীন প্রেসিডেন্ট গ্রোভার ক্লিভল্যান্ড মনে করেছিল, ১লা মে তারিখে যেকোনো আয়োজন হানাহানিতে ও সংঘর্ষে পর্যবসিত হতে পারে। তাই, ১৮৮৭ খ্রিস্টাব্দেই তিনি নাইটের সমর্থিত শ্রম দিবস পালনের প্রতি ঝুঁকে পড়েন।

আলজেরিয়ায়, শ্রমিকদের সবেতন ছুটির দিন হিসাবে ১লা মে আন্তর্জাতিক শ্রমিক দিবস উদযাপিত হয়ে আসছে ১৯৬২ সাল থেকে।

আর্জেন্টিনায় মে দিবসে, সাধারণ ছুটি থাকে এবং সরকারিভাবে উদযাপন করা হয়। সেইসাথে, প্রধান শহরগুলোতে রাস্তায় শ্রমিক শোভাযাত্রার আয়োজন করা হয়। এছাড়াও, বিভিন্ন আলোচনা সভার আয়োজন করা হয়ে থাকে। ১৯৩০ খ্রিস্টাব্দে আর্জেন্টিনায় আন্তর্জাতিক শ্রমিক দিবস উদযাপিত সহ সরকারি ছুটি ঘোষণা করা হয়।

ব্রাজিলে ঐতিহ্যগতভাবে, অধিকাংশ পেশাদার বিভাগের ন্যূনতম বেতনকাঠামোর পুনঃনির্ধারন করা হয়। শ্রমিক ইউনিয়নগুলো দিনব্যাপী আলোচনা অনুষ্ঠানের আয়োজন করে থাকে। ব্রাজিলে শ্রমিক দিবস সাধারণ ছুটি হিসেবে পালিত হয়।
এছাড়াও, হাইতিতে ১লা মে সরকারি ছুটি থাকে যা কৃষি ও শ্রম দিবস নামে পরিচিত।

বাংলাদেশে ১লা মে সরকারি ছুটি ঘোষণা করা হয়েছে। এই দিবস উপলক্ষে রাষ্ট্রপতি ও প্রধানমন্ত্রী বাণী দিয়ে থাকেন। সরকারি-বেসরকারি বিভিন্ন সংস্থা ও সংগঠনগুলো দিনটি পালনে শোভাযাত্রা, সেমিনার, শ্রমিক সমাবেশ, সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান, ও আলোচনা সভার সহ নানা কর্মসূচি নিয়ে থাকে। এই মে দিবসে বিভিন্ন ট্রেড ইউনিয়ন, শ্রমিক ফেডারেশন ও রাজনৈতিক দল-সহ বিভিন্ন সংগঠন পৃথকভাবে কর্মসূচি গ্রহণ ও বাস্তবায়ন করে থাকে।

সর্বোপরি, বিশ্বের সকল দেশের প্রতিপাদ্য বিবেচনায়, বিশ্ব মে দিবসের প্রতিপাদ্য হলে-” আন্তর্জাতিক শ্রমিক দিবসের অঙ্গীকার, বেকারমুক্ত বিশ্ব গড়ার। “